বাংলাদেশ সফ্টওয়্যার এবং আইটি ব্যবসায়: সাম্প্রতিক ট্রেন্ড ও মার্কেট অবস্থান

গত কয়েক যুগে বাংলাদেশ সফ্টওয়্যার শিল্পে দুরগন্তব্য পাড়ি দিয়েছে। বর্তমানে আছে পূর্নতা পর্যায়ে। বাংলাদেশ এখন আর সাইডলাইনে নেই । শিল্পটি কেবল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেই ভুমিকা রাখছে না, বরং ‍উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যুবক গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থানে সহায়তা করছে। শিল্পের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো- বড় পরিমানে তরুন উদ্যোক্তার উপস্থিতি। এক যুগ ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে অনেক টেকি গ্র্যাজুয়েটরা দেশের বাইরে থেকে পড়াশোনা করে দেশে নতুন ভেঞ্চার চালু করছে।

ইন্ডাস্ট্রি সাইজ

স্থানীয় ও বৈশ্বিক অনেক বাধা-বিপত্তি থাকা সত্ত্বেও, উদ্যমি উদ্যোক্তাগন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যবসায় স্থাপনে গুরুত্বপূর্ন উন্নতি সাধন করেছে। অবশ্যই, তাদের উৎসাহ ও স্থিতিস্থাপকতাই প্রধান ড্রাইভিং ফোর্স।

1

ফিগার- ১: বাংলাদেশ সফ্টওয়্যার ও আইটি ইন্ডাস্ট্রি (সূত্র: বেসিস ওয়েবসাইট)

বেসিস এর গবেষণা মতে, বাংলাদেশে ৮০০ প্রতিষ্ঠানেরও বেশি এই সফ্টওয়ারও আইটিইএস (আইটি এনাবল্ড সার্ভিসেস) কাজ করার জন্য নিবন্ধিত হয়েছে। উপরন্তু, আরও প্রায় শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অনিবন্ধিতভাবে এবং বাসায় বসে দেশেও বাইরে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রি সাইজ আনুমানিক ২৫০ মিলিয়ন ডলার বা ১৮০০ কোটি টাকা। ধারনা করা হয়, ৩০,০০০ প্রফেশনাল এই শিল্পে কাজ করে যাচ্ছে। অন্যান্য মেইনস্ট্রিম শিল্পের তুলনায়, এই শিল্প ততো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। উচ্চ পর্যায়ের (গড় কমপেনসেশন ১৫০০০ টাকা) নিয়োগ প্যারামিটারে সফ্টওয়্যার ও আইটি সেক্টর বাংলাদেশের নিয়োগদাতাদের একটি।

বেসিস এ নিবন্ধিত ৩০০ আইটি প্রতিষ্ঠানের উপর সম্প্রতি এক গবেষনা চালানো হয়। গবেষনাটি হয় ব্যবসায় ধরন, ভলিউম এবং আকার এর ভিত্তিতে। ৭০% কোম্পানিই সফ্টওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও মেইটেনেন্স এর সেবা দিয়ে থাকে। অর্ধেকের মতো কোম্পানিই ড্যাটা প্রসেসিং, গ্রাফিক/ওয়েব ডিজাইন এবং কন্টেন্ট ম্যানেজমেন্ট সেবা প্রদান করে (নিচের চিত্রটি উল্লেখযোগ্য)।

2

ফিগার- ২: বেসিস মেম্বার কোম্পানিগুলোর বিশেষায়িত পন্য ও সেবা (সূত্র: বেসিস ওয়েবাসাইট)

উদ্দিপনামূলক সাম্প্রতিক ট্রেন্ডগুলোর মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন (যেমন: ইন্টারনেট ব্যবহার বৃদ্ধি, উত্তম সংযোগ এবং নতুন নতুন পেমেন্ট সিস্টেম- অনলাইন পেমেন্ট, ক্রেডিট কার্ড এবং মোবাইল পেমেন্ট) নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৪৫ শতাংশ কোম্পানিই আইটি, সফ্টওয়্যার ও ওয়েব-বেইজড সেবায় নিবেদিত। কিছু ভেঞ্চার ব্যবসায় করছে ইকমার্স, ইলার্নিং এবং পেমেন্ট ইন্টামিডিয়ারি হিসেবে। এসব নতুন নতুন সেক্টর বাংলাদেশের তথ্য প্রযুক্তি শিল্পকে নতুন তরঙ্গ এনে দেবে।

কোম্পানি সাইজ সম্পর্কে বলতে গেলে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নিবেদিত প্রফেশনালদের সংখ্যা ১০ থেকে ৫০ জন। এবং কর্মী সংখ্যার সাথে রেভিনিউ এর একটা সম্পর্ক রয়েছে। যে প্রতিষ্ঠানের কর্মী বেশি সে প্রতিষ্ঠনের রাজস্বও বেশি। গবেষনায় দেখা যায়, ১০০ জনের বেশি কর্মী আছে এমন কোম্পানির বার্ষিক রাজস্ব ৫ কোটিরও উপরে। ১০-৩০ জন কর্মী কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠানের আয় ১-৫০ লাখ টাকা।

3

ফিগার- ৩: কোম্পানি আকার ও আয় (সূত্র: বেসিস ওয়েবসাইট)

অাভ্যন্তরিন মার্কেট: ক্রমবিকাশে প্রেরণা দিচ্ছে প্রাইভেট সেক্টর চাহিদা

সফ্টওয়্যার ও আইটি ব্যবসার মুখ্যাংশ গড়ে উঠেছে লোকাল মার্কেটের চাহিদাকে কেন্দ্র করে। বেসিস মেম্বারদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ কোম্পানিই আভ্যন্তরিন মার্কেটে কাজ করে যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে ২০-৩০ শতাংশ চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রেন্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্রেতার চাহিদা ও সরবরাহকারির যোগান-সমাধান বাংলাদেশের মার্কেটকে পূর্ণ ও পরিপক্ক করছে।

4

ফিগার- ৪: সফ্টওয়্যার কোম্পানিগুলোর বিশেষায়িত সেবা (সূত্র: বেসিস ওয়েবসাইট)

পাবলিক সেক্টরে আইটি সেবার ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও প্রাইভেট সেক্টরই মার্কেট শেয়ারকে ডমিনেট করছে। লোকাল মার্কেটকে টার্গেট ধরে যারা আইটি ব্যবসায় করছেন তাদের মধ্যে ১১০ টি প্রতিষ্ঠানের উপর চালানো জরিপে এই ফলাফল বেরিয়ে আসে। পন্য ও সেবাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: বিজন্যাস ইআরপি, এ্যাকাউন্টিং সফ্টওয়্যার, এইচআর সফ্টওয়্যার, সেল্স অটোমেশন, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ইত্যাদি।

ব্যাংক, বীমা এবং অন্যান্য ফিনানসিয়াল প্রতিষ্ঠানগুলোই হলো আইটি কোম্পানিগুলোর পটেনশিয়াল কাস্টমার। ব্যাংকিং সেক্টরে মূল সফ্টওয়্যারগুলোর মার্কেটে প্রভাব খাটাচ্ছে বিদেশি কোম্পানিগুলো। তবে, দেশি কোম্পানিগুলোও সেই সফ্টওয়্যার উৎপাদনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

উৎপাদনমূখী শিল্প (যেমন: রেডিমেইড গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিকেলস এবং অন্যান্য খাদ্য পন্য শিল্প) চাহিদা সৃষ্টি করছে ইআরপি, এইচআর ইনফরমেশন সিস্টেম, প্রোডাকশন এবং ফিন্যানসিয়াল ম্যানেজমেন্ট সলিউশন এর। অপর দিকে, টেলিকম ইন্ডাস্ট্রি (চাহিদায় ফিনানসিয়াল প্র্রতিষ্ঠানের পর ২য় অবস্থান), খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা, স্বাস্থ্য সেবা (হসপিটাল-ডায়াগনোস্টিক সেন্টার), শিক্ষাখাত (বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং স্কুল), প্রচার মাধ্যম এবং রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর বাংলাদেশের মার্কেটকে বড় অবস্থান দিয়েছে। যারা কোন নির্দিষ্ট শিল্পকে কেন্দ্র না করে সেবা দিচ্ছেন, তারাও টিকে আছেন বিভিন্ন ওয়েববেইজড সেবা দিয়ে। এগুলোর মধ্যে হলো: সাধারন আইটি সলিউশন, এ্যাকাউন্টিং সলিউশন, ওয়েবসাইট ডিজাইন, সিআরএম, সেল্স অটোমেশন, অফিস ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি।

রপ্তানি বাজার: নতুন আশা

উচ্চাকাঙ্খা সত্বেও, গত এক যুগ ধরে সফ্টওয়্যার ও আইটি সেবায় ভালো অবদান রাখতে পারে নি। অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের এক্সপোর্ট ভ্যালু এখনও অনুর্বর। কারন হিসেবে পাওয়া যায়: নিষ্প্রভ পারফরমেন্স, অবকাঠামোগত সমস্যা, গুনগত মানের আইটি প্রফেশনালের অভাব, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিং কার্যাবলির অভাব। যাহোক, ২০১০ এবং ২০১১ সালে বাংলাদেশের ভালো কর্মসম্পাদন হয় যা আসন্ন বছরগুলোতে ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে গার্টনার (গ্লোবাল কনসাল্টিং গ্রুপ) ৩০ টি আউটসোর্সিং গন্তব্যের নাম উল্লেখ করা হয়। এই লিস্ট এ সর্বপ্রথম বাংলাদেশের নাম লিপিবদ্ধ হয়। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের আইটি ইন্ডাস্ট্রির উপর বিদেশি ক্রেতাদের ইতিবাচক ধারনা তৈরি করবে। এবং ইতিমধ্যে, বিশ্বব্যাপী কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে আউটসোর্সিং গন্তব্য বা ব্যাক-অফিস লোকেশন হিসেবে বিবেচনা শুরু করে দিয়েছে। কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রির বিশ্বনেতা স্যামসাং ২০১০ সালে দুই শতাধিক ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে হাই-টেক রিসার্চ এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার উদ্বোধন করে। বাংলাদেশ হলো স্যামসাং এর দ্বিতীয় বৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। স্যামসাং ছাড়াও বিশ্বখ্যাত কোম্পানিগুলোও (এএমডি, এলজি, আইবিএম) তাদের ব্যাক-অফিস এবং সাপোর্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রসেসিং এ আছে। তদোপরি, উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং পশ্চিমা দেশগুলোকে অফশোর সেবা দেয়ার জন্য ৩০টিরও বেশি জয়েন্ট ভেঞ্চার গত কয়েক বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

5

ফিগার-৫: রপ্তানি হার (সূত্র: বেসিস ওয়েবসাইট)

এসব অফিসিয়াল আউটসোর্সিং/অফশোর ব্যবসায় ছাড়াও, গত কয়েক বছর ধরে যুবক আইটি বিশেষজ্ঞরা দেশের বাইরের ক্লায়েন্টকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে, যাকে ফ্রিল্যান্সিং বলে থাকি। এদের মধ্যে যেসব কাজ বেশি করা হয়; সফ্টওয়্যার ও ওয়েব ডিজাইন, মোবাইল এ্যাপলিক্যাশন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, এসইও, সোস্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এবং ড্যাটা প্রসেসিং সুনাম অর্জন করেছে। যদিও তারা ব্যক্তিগতভাবে ছোট প্রজেক্টের কাজ করে, তাদের উপার্জন অগুরুত্বপূর্ন নয়। রেকর্ড হয়না বিধায় তাদের উপার্জনের প্রকৃত ধারনা পাওয়া সম্ভব নয়। শিল্প বিশেষজ্ঞগন অনুভব করেন যে, ফ্রিল্যান্সার ও নতুন উদ্যোক্তাদের সমর্থনও পথপ্রদর্শন করা হলে এই শিল্পে তাদের অবদান আরও বেশি হবে।

বেসিস গবেষনা অনুযায়ি, ১৬০টি কোম্পানি বর্তমানে সফ্টওয়্যার ও আইটি সেবা এক্সপোর্ট করে যাচ্ছে। এদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশই ১০০ ভাগ রপ্তানি বেইজড। রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে উত্তর আমেরিকাই প্রভাব বিস্তার করছে। অপরদিকে, ইউরোপে ইউকে, ডেনমার্ক, এবং নেদারল্যান্ডস নতুন গন্তব্য যোগ হয়েছে। কেউ কেউ এশিয়ান মার্কেটেও (মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব এবং দক্ষিন আফ্রিকা) সফল হয়েছেন।

দরকার কারিগরি দক্ষতা

6

ফিগার- ৬: কারিগরি যেসব দক্ষতা প্রয়োজন (সূত্র: বেসিস ওয়েবসাইট)

ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, সংখ্যাগুরু সফ্টওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলো নমনীয় প্রযুক্তি দক্ষতার কৌশল বেছে নিচ্ছেন। খুব সম্প্রতি, মোবাইল কেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্মগুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। কিছু কোম্পানি শুধুই মোবাইল ভিত্তিক (এ্যান্ড্রয়েড, আইওএস, জেটুএমই এবং কিউটি) দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিচ্ছে।

Spread the love

Comments

comments

Leave a Reply