বাংলাদেশ পোষাক শিল্পের ভবিষ্যত

ননট্র্যাডিশনাল ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৮। তিন দশক সময়ের ব্যবধানে শিল্পটি রুপ নিয়েছে অর্থনীতির প্রাণশক্তি এবং কর্মসংস্থানের বৃহত্তম সেক্টর হিসেবে। বিশ্বের পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ এখন বাংলাদেশ। গত সময়ের মধ্যে শিল্পটি বিভিন্ন সফলতা ও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষজ্ঞগন মতামত দেন যে, বাংলাদেশের এই শিল্পের ভবিষ্যত উজ্জল। বিজিএমইএ প্রকাশিত ম্যাগাজিন দ্য এ্যাপারেল স্টোরি কয়েকজন সফল ও প্রতিস্রুতিপূর্ন উদ্যোক্তার সাথে কথা বলেছে। উদ্দেশ্য ছিলো গার্মেন্টস শিল্পের ভবিষ্যত সম্পর্কে ধারনা অর্জন করা এবং ২০৩০ সালে বাংলাদেশের ফ্যাক্টরির অবস্থান কেমন হবে তা জানা। দ্য এ্যাপারেল স্টোরিতে প্রকাশিত নিবন্ধটির সারসংক্ষেপ ও উদ্যোক্তাদের প্রদত্ত অভিমত এই নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়।

ডিবিএল গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো: আবদুল জব্বার মনে করেন যে, ২০৩০ সালে বাংলাদেশ নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার দিক থেকে বিশ্ব-স্বীকৃত বেঞ্চমার্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। “সামাজিক ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট যে নিয়ম কানুন আরোপ করা আছে, বর্তমানে বড় কারখানাগুলো তা যথাযথ পালন করছে। অন্যান্য এসএমইগুলোও দ্রুত সেই অনশীলন শুরু করবে। এবং, ২০৩০ সালে এই শিল্পে গুরুত্বপূর্ন উন্নতি লক্ষ্য করা যাবে।”  তিনি আরও বলেন যে, মিডল ম্যানেজমেন্টে বর্তমানে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। ২০৩০ সালে তা দক্ষ ও প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান সম্পন্ন মানবসম্পদ নিয়ে ব্যাপক পরিমানে উন্নতি লাভ করবে যা এ্যাপরেল ইন্ডাস্ট্রির প্রবৃদ্ধি মেশিনের গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

ভিয়েলাটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান ডাভিড হাসানাত জানান যে, বাংলাদেশের ওয়ার্কাররা চমৎকারভাবে শিল্পকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। তিনিও দুর্বলতা খুজে পান মিডল ম্যানেজমেন্ট এ। মিডল ম্যানেজমেন্ট এ দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মানব সম্পদের তাগিদ অনুভব করেন। ডিবিএল ম্যানেজিং ডিরেক্টরের মতামতকে সমর্থন দিয়ে তিনি বলেন, আসন্ন সময়ে মধ্য-ব্যবস্থপনায় দক্ষ ব্যবস্থাপক যুক্ত হয়ে শিল্পের উন্নয়ন ঘটাবে। ২০৩০ সালে উন্নয়ন ঘটবে এমন আরেকটি বিষয় তুলে ধরেন, তা হলো- পরিবেশ ধ্বংস না করে ফ্যাক্টরি পরিচালনা করা। “যদি দশ বছর আগের কথা বলি, শুধুমাত্র ভিয়েলাটেক্সেই ইকো-ফ্রেন্ডলি প্রোডাকশন নিশ্চিত করেছিলো। কিন্তু এখন অনেক ফ্যাক্টরিই এই বিষয়টির উপর নজর রাখছে এবং ইকো-ফ্রেন্ডলি প্রোডাকশন কার্য পরিচালনা করছে।”  যাহোক তিনি আরও একটি ইস্যুর কথা বলেন, তা হলো- কারখানা অবকাঠামো। তিনি পরামর্শ দেন, সর্বপ্রথম আমাদের সেবার মান বাড়াতে হবে এবং গ্লোবাল মার্কেট শেয়ার আরও বড় আকারে অর্জন করতে হবে।

এপিলিয়ন গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর রিয়াজ উদ্দিন আল মামুন তো আরও জোর গলায় বলেন,২০৩০ সালে কোন নন-কমপ্লয়েন্ট ফ্যাক্টরিই থাকবে না। কিছু কিছু কোম্পানি এখন পুন:নবায়ন যোগ্য শক্তি ব্যবহার করছে। ২০৩০ সালে অধিকাংশ ফ্যাক্টরিই পাওয়ার সাপ্লাই এ স্বনির্ভরতা অর্জন করবে এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন সম্ভব হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ন পরিবর্তন হতে পারে, তা হলো- দক্ষ ইন্ডস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ার এবং রিসার্চ এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগে। জনাব মামুন আরও বলেন যে, ২০৩০ সালে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফ্যাক্টরিগুলো আরও আধুনিক ও অগ্রসর হবে।

লুতফে এম আয়ূব- চেয়ারম্যান, রাবাব গ্রুপ মনে করেন, ২০৩০ সালে এমন কোম্পানিগুলোই টিকে থাকবে যারা বায়ারদের বিশ্বাস ও স্বীকৃতি অর্জন করতে পারবে এবং যাদের ডেলিভারি ও সাপ্লাই চেইন সেবা হবে শক্তিশালী। উন্নত উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন কোম্পানিই টিকে থাকতে পারবে। “আমি মনে করি, বাংলাদেশ থেকে পোশাক শিল্পটি নিকট ভবিষ্যতে যাচ্ছে না। তবে, আমাদেরকে প্রস্তুত করতে হবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য। শিল্পের উন্নয়নের জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যূৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।”

তরুন উদ্যোক্তা, ক্লাসিক গ্রুপের পরিচালক ইরফান আজিম বলেন, দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তাদেরকে এই শিল্পে যুক্ত করতে পারলে শিল্পের প্রবৃদ্ধি খুব দ্রুত হবে। কারন, প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের মাইন্ডসেট এ গুনাগুন সম্পর্কিত পার্থক্য রয়েছে। তিনি আরেকটু ব্যাখ্যা দিয়ে ব্যাপারটি পরিষ্কার করেন, “প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তাগন এক স্টাইলের ১ লক্ষ পিস পণ্যের অর্ডার নেন। কিন্তু দ্বিতীয় প্রজন্মের অধিকাংশ উদ্যোক্তাগন ৩০ টি স্টাইলের ৩০ হাজার পিস পন্যের অর্ডার নেন। আমার বায়ারদেরকে বিভিন্ন ডিজাইনের পন্যের নমুনা প্রদর্শন করি। তখন দাম নিয়ে দর কষাকষিতে ক্রেতার পরিবর্তে আমার ভিত্তি শক্তিশালী থাকে। সরকার যদি গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারে বাংলাদেশ এমন অবস্থানে পৌছাবে যা এখন কল্পনাও করা সম্ভব নয়।”

ম্যাককিনসির রিপোর্ট অনুযায়ি, বাংলাদেশের অগ্রগতির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২০ সালে ৪৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করতে পারবে। আর বাংলাদেশ সরকার টার্গেট করেছে, ২০২১ সালে ৫০ বিলিয়ন ডলারের। লক্ষ্যার্জন বড় কঠিন নয়। তবে, যদি চ্যালেঞ্জগুলোকে ওভারকাম না করতে পারে, তখন তা কঠিনই হবে। সে জন্য উন্নত করতে হবে, অবকাঠামো, বিশেষ করে যোগাযোগ ও এনার্জি সেক্টর। বায়ারদের ডেডলাইন মিট করার জন্য দরকার হাইওয়ে তে যানজট নিরসন এবং চিটাগং পোর্টে কার্গো হ্যান্ডলিং ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি করা। তাছাড়াও এই শিল্পে মিডল ম্যানেজমেন্টকে আরও দক্ষ ও শক্তিশালী করতে হবে। ডিজাইন, মার্চেন্ডাইজিং ও মার্কেটিং কৌশল উন্নত করতে হবে। এই শিল্পে চিনের সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ। তাদের ডিরেক্ট বিনিয়োগের সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ। এ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে অবকাঠামো উন্নত করে ফেলতে হবে।

Spread the love

Comments

comments

Leave a Reply