ইউরোপীয় পোশাক বাজারে প্রবেশ করতে কী কী প্রতিযোগিতার সম্মুখিন হতে হবে?

স্বল্পোর্ধ্বগতি এবং সমক্ষমতা সম্পন্ন পোশাক প্রস্তুতকারক এর অংশগ্রহন ইউরোপকে কঠিন প্রতিযোগিতার মার্কেটে চরিত্রায়িত করেছে। ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদেরকে ভালো মানের পন্য সরবরাহ করে উচ্চ শ্রেণীর ক্রেতাকে টার্গেট করতে হবে। সেই সাথে সচল রাখতে হবে বলিষ্ঠ মার্কেটিং কৌশল। ক্রেতার সাথে ভালো সম্পর্ক হলো উন্নতির চাবি। যে সব কোম্পানি নমনীয়, গতিময়, বিশেষ ও ব্যবহারিক জ্ঞানসম্পন্ন; তারা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ভোগ করবে। একজন নতুন রপ্তানিকারক কতগুলো প্রতিযোগিতার সম্মুখিন হতে পারেন, নিচে তার আলোচনা করা হলো।

১. মার্কেটে প্রবেশ

প্রতিযোগিতা মাঝারি কিন্তু নতুন প্রবেশকদের হুমকি বাড়ছে

ইউরোপিয়ানদের উচ্চ চাহিদা মার্কেটে প্রবেশকে কঠিন করে তুলেছে। মার্কেটকে আকার দেয়া হয়েছে ক্রেতার কঠোর আইনগত ও আইন বহির্ভুত দাবির সম্মিলনে। তারপর, এই মার্কেটে সফল হতে হলে কাজে ও মানে পেশাদারীত্ব থাকতে হবে। পরিবহন ও সাপ্লাই চেইন এর সুবিধার ফলে ইউরোপ মার্কেটে পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। শপিং-করার-সময় ও লেনদেনে স্বচ্ছতা সাম্প্রতিক সময়ে ক্রেতার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এভাবে সাপ্লায়ারের কাছেও গুরুত্ব বহন করে। অন্যদিকে, সাপ্লায়ারদের মধ্যে নীতি ও মানগত পার্থ্ক্য অতি অল্প এবং সাপ্লায়ার পরিবর্তন খরচ খুবই তুচ্ছ। এই বৈশিষ্ঠ্য নতুন সাপ্লয়ারদেরকে প্রবেশের সুযোগ করে দিচেছ। অনলাইনে ডিস্ট্রিবিউশন পদ্ধতি আরও সহজ করে দিচ্ছে। যাইহোক, কয়েক বছরের অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠছে, আগামী বছরগুলোতে ইউরোপ ভালো কার্যকরি হবে। গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক দেশে (চীন) শ্রমিক ও কাচামাল খরচ বৃদ্ধি বায়ারদেরকে অন্য সাপ্লায়ার খুজতে বাধ্য করছে। এক্ষেত্রে চলমান উৎপাদক দেশে (বাংলাদেশ, ক্যাম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনাম) অধিক সংখক রপ্তানিকারকের দ্বারস্ত হতে হবে। তবে অন্য কোথাও যদি আরও কম দামে ভলো সাপ্লায়ার পাওয়া যায়, তারা সেদিকেও (যেমন: ইথিওপিয়া, তানযানিয়া, কেনিয়া এবং অন্যান্য সাব-সাহারান দেশ) গমন করতে পারে।

টিপস:

– মার্কেট এ্যাক্সেস রিকোয়ারমেন্ট সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখতে হবে। বায়ারের দাবি পূরণ করার স্বক্ষমতা থাকতে হবে।

– যথোপযুক্ত এলাকায় যেখানে ক্রমবিকাশের সম্ভাবনা বেশি এবং প্রতিযোগী কম, সে এরিয়াতে ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারক আকর্ষনীয় সুযোগ পেতে পারে। তবে রাতারাতি সম্ভব নয়। এটি এক প্রকার ক্রমিক প্রক্রিয়া যার জন্য প্রয়োজন যথাযথ অভিজ্ঞতা। ছোট, স্বাধীন (মাল্টি অথবা মোনো ব্র্যান্ড) বিশেষায়িত দোকানে বিক্রির জন্য পরামর্শ দেয়া যায়। মানের দিকে ফোকাস করুন এবং (ব্যতিক্রম স্টাইল, আরামদায়ক ফ্রেব্রিক এবং ডিজাইন এর মাধ্যমে) নিজেকে সবার থেকে আলাদা হিসেবে তুলো ধরুন।

– ইউরোপ মার্কেটে নতুন হলে, ব্যবসায়িক চুক্তির জন্য বানিজ্য মেলা এবং কনফারেন্সে অংশগ্রহনের পরামর্শ দেয়া যেতে পারে।

২. প্রোডাক্ট কম্পিটিশন

টার্গেট গ্রুপে বিকল্প পন্য অবস্থানের সম্ভাবনা

বিকল্প পন্যের প্রতিযোগিতা নির্ভর করে ডেমোগ্রফিক বৈশিষ্ট্যের উপর (বয়স, ইনকাম, লিঙ্গ, এবং শিক্ষা)। গুনাগুন বা ডিজাইনের দিক থেকে একেক সেগমেন্টের চাহিদা একেক রকম হতে পারে। উদাহরনস্বরুপ বলা যায়, মধ্যম/উচ্চ শিক্ষিত যুব ভোক্তাগণ কিনতে চাবে উচ্চমান সম্পন্ন, টেকশই পোশাক (কিন্তু গতানুগতিক ব্যয়ে)। শৌখিন ভোক্তাদের বেলায়, পোশাক হলো এক প্রকার উচ্চাভিলাসি উপাদান যা গ্যাজেট (স্মার্টফোন, ট্যাবলেটস, হাত ঘাড়ি বা অন্যান্য বিলাসি পন্য) এর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে। সুতরাং, উন্নয়নশীল দেশের রপ্তানিকারকদের কাছে সেগমেন্ট নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, সাপ্লায়ারের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ভালো করে জানতে পারবে এবং সুযোগ খুজে নিতে পারবে (যেমন: সম্মিলিত গ্যাজেট এবং পরিধেয় প্রযুক্তি বাজারজাতকরন পদ্ধতি)

টিপস:

– যদি টেকশই সুতার পোশাক প্রস্তুত করতে পারেন অথবা সৃজনশীল ম্যানমেইড সুতা এবং ফেব্রিক বাজারজাত করতে পারেন, তাহলে প্রতিযোগীদের থেকে বেশি সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন। নতুন নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল (ডায়িং পদ্ধাতি) সম্পর্কে আপডেটেড থাকতে হবে এবং নিয়মিত ট্রেড ফেয়ারে উপস্থিত থাকার পাশাপাশি ফেব্রিক প্রস্তুতকারকদের সাথে এ্যলায়েন্স গড়ে তুলতে হবে। ইউরোপের ফেয়ারে যোগ দিন এবং যাদের স্টেট-অব-আর্ট (কাটিং এজ প্রযুক্তি বা সর্বাধুনিক প্রযুক্তি) উপাদান রয়েছে তাদের সাথে থাকুন।

– ফ্যাশন ওয়েবসাইট অনুসরন করে অথবা মেলায় অংশগ্রহন করে ফেব্রিকস, কালার, স্টাইল এবং এ্যাক্সেসরিজের সম্প্রতিক ট্রেন্ড সম্পর্কে আপ টু ডেট থাকুন।

৩. কোম্পানি প্রতিযোগিতা

প্রতিযোগিতা প্রায় হিংস্র প্রকৃতির

এ্যাপরেল শিল্পে অধিক সংখ্যক সমজাতীয় উৎপাদকের উপস্থিতির ফলে উচ্চমাত্রার প্রতিদ্ধন্দ্বিতা রয়েছে। যারা স্বল্প ব্যয়ে উৎপাদন করতে পারবে ইউরোপের মার্কেটে প্রবেশের আকর্ষনীয় সুযোগ। সবাই একই গুনাগুন ও মানের পোশাক উৎপাদন করলে প্রতিযোগিতার মাত্রা বেড়ে যাবে। এই ব্যাপারটিতে আধিপত্য বিস্তার করে বড় উৎপাদকগন এবং মূল্য নির্ধারনেও প্রতিদ্ধন্দিতা করতে পারে। এই সেগমেন্টে ছোট ও মঝারি আকারের উৎপাদক প্রতিদ্ধন্দ্বিতা করতে হিমশিম খাবে। মধ্যম ও উচ্চ শ্রেণীর মার্কেটে পন্যের ভিন্নতা বেশি। এই গ্রুপের ভোক্তাগন পণ্যের মূল্যের উপর কম নজর দেয়। পন্যের মান, ডিজাইন ও টেকশই কিনা তার প্রতি তাদের নজর বেশি।

এ্যাপারেল সোর্সিং এ চীন প্রথম হটস্পট হওয়া সত্বেও আরও অনেক উন্নয়নশীল দেশ ইউরোপের মার্কেটে প্রবেশ করার সুযোগ পাচ্ছে। এই সুযোগের পিছনের কারন হলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জিএসপি (জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেনস) সুবিধা যা কার্যকর হয় ২০১৪ সালে। এই জিএসপি নীতিমালা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ট্যারিফ কমিয়ে নতুন করে নির্ধারন করা হয়। এই সুবিধার ফলে যে সব দেশকে (চীন, মরক্কো, তিউনিশিয়া) ট্যারিফ পরিশোধ করতে হয় না তাদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও ইইউ ক্রেতাগন ভবিষ্যতে এশিয়া থেকেই পোশাক আমদানি করতে থাকবে, তারপরও নতুন বিকল্প সোর্সিং পয়েন্টের সন্ধানে রয়েছে।

এই ফাকে, ইউরোপিয়ান  উৎপাদকগন নিজেদের  ‍পুনর্গঠনে সমর্থ হয়েছে, যা তাদেরকে প্রতিদ্ধন্দ্বিতার উচ্চ শিখরে নিয়ে যাচ্ছে। টক্কর দেয়ার দৌড়ে তারা অনেক সুবিধা ভোগ করছে। যেমন: উচ্চমাত্রার সহনশীলতা, অল্প সময়ে ডেলিভারি প্রদান, মান ও আকর্ষনীয় ডিজাইন, উৎপাদন ক্ষমতা এবং সৃজনশীলতা। এর ফলে, হাই-এন্ড বা উচ্চভিলাসি বা আল্ট্রা ফ্যাশনেবল পন্য উৎপাদন এখনও পূর্ব ইউরোপেই (তুর্কি, উত্তর আফ্রিকা, পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি) রয়ে গেছে।

টিপস:

– প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে, ক্রেতার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে এবং কিছু অতিরিক্ত সুবিধা ও প্রতিযোগতামূলক দাম ঠিক করতে হবে। প্রি প্রোডাকশন সার্ভিস, সোর্সিং, প্রোপোযাল সংগ্রহকরন, ফরওয়াডিং সুবিধা ও ক্যাপাসিটি বৃকিং এ সুবিধা রয়েছে। অন্যান্য প্রতিদ্ধন্দ্বিদের তুলনায় অধিক সুবিধা যোগ করে আপনার পন্যের স্বতন্ত্রতা তুলে ধরুন।

৪. বড় ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতা বেশি

ইউরোপিয়ান এ্যাপারেল সেক্টরে ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতা বেশি। আকারে বড় কোম্পানির কাছে সরবরাহ দিতে গেলে বেশি প্রতিদ্ধন্দ্বিতা করতে হয়। কিন্তু, ছোট ও মাাঝারি আকারের ক্রেতার সাথে ব্যবসায়ে ক্ষেত্রে তাদের মুলামুলি করার ক্ষমতা কম থাকে। এই ক্ষেত্রে ক্রেতা মূল্য সংবেদনশীল হয় না। তারা সন্ধান করেন উন্নত ফেব্রিক ও ভালো মানের পোশাক এবং হাল আমলের ডিজাইন। নোট রাখা প্রয়োজন যে, টার্গেট কাস্টমারের সাথে পেরে উঠতে হলে দরকার এই মার্কেটের জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা। পন্যের মান ও ডিজাইনে নিপুণতা আনতে এই উপাদানগুলোর চাহিদা রয়েছে।

টিপস:

যোগাযোগের মাধ্যম ও সেবামূলক কার্যক্রমকে প্রকৃতপক্ষেই স্বতন্ত্র ও লক্ষনীয় করে তুলুন এবং পন্যের প্রচারনা চালান। উদাহরনস্বরুপ: পোশাকগুলো কিভাবে উৎপন্ন হচ্ছে এবং কারা বানাচ্ছে তা নিয়ে গল্প বলুন। টেকশই পণ্য তৈরি ও পরিবেশ রক্ষার দিকে নজর দিন।

৫. সরাবরাহকারীর ক্ষমতা গড়পড়তা বা মাঝারি

এই শিল্পে অনেক কাচামাল সরবরাহকারি আছে, কিন্তু এক সরবরাহকারী থেকে অন্য সরবরাহকারীর কাছে পৌছাতে সময় ও অর্থ দুইই বেশি খরচ হয়। সরবরাহকারীরা সবাই একই ধরনের, কারন, তারা যেসব উপাদান ব্যবহার করে থাকেন তা ততোটা ভিন্ন হয় না। যেসব উপকরণের চাহিদা বাড়ছে এবং সবসময় যার প্রাপ্যতা নেই (কটনের বিকল্প-অর্গানিক কটন, বাশ, শণ, জৈব-ভিত্তিক উপকরন) অথবা যারা সৃজনশীল কোন কাচামাল আবিষ্কার করে মার্কেটে ছাড়তে পারে তাদের বিক্রি ক্ষমতা বেড়ে যাবে। তারোপর, গুনাগুন সম্পর্কে বিস্তারিত সচেতনতা এবং উচ্চমান সম্পন্ন কাচামাল সরবরাহ দিয়ে বিক্রি ক্ষমতা বাড়ানো যেতে পারে।

টিপস:

– নিশে মার্কেটে আগ্রহী হলে অবশ্যই মনে রাখুন যে, কাস্টমারের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। সম্পর্কটাই এই ব্যবসায়ের অতীব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

– সাপ্লাই চেইনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি, কাচামালের উৎপত্তিস্থল এবং তার অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। সাপ্লাই চেইনের ম্যাপ তৈরি করুন, ঝুকি সনাক্ত করুন এবং কমিয়ে আনুন। সেই সাথে, সমমনা সপ্লায়ারদের সাথে সময় বিনিয়োগ করুন।

 

Spread the love

Comments

comments

Leave a Reply